Header Ads

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মহাসাধক আঃ হালীম হুছাইনী (রহঃ)

 

বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মহাসাধক আঃ হালীম হুছাইনী (রহঃ)


সুলতান আফজাল আইয়ূবী


এ দেশের যে সকল মহামনিষী দেশের মানুষদের ঈমান, আক্বিদা ও বিশ্বাসকে সমৃদ্ধ করেছেন, আল্লাহর প্রতি মানুষদের আস্থাকে সুদৃঢ় করেছেন, মানুষদেরকে কুরআনের আলোয় আলোকিত করেছেন, রাসূলের অনসৃত পথে মানুষদেরকে আহবান করে গেছেন। জাতি, ধর্ম ও মানবতার কল্যানে আজীবন মানুষদেরকে সত্যের পথের পথিক করার জন্য আমরণ প্রচেষ্ঠা করে গেছেন তাদের মধ্যে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার তারাকান্দি গ্রামের আ: হালিম হুসাইনী রহ. অন্যতম। তার পুরো নাম আবু বকর সিদ্দিক আ: হালিম হুসাইনী। পিতা মাও: কায়েমুল্লাহ, মাতা :নজিবুন্নেসা। পড়াশুনার হাতেখড়ি মায়ের হাতেই। তাঁর মা প্রতিদিন ভোরে বাড়িতে মাক্তাব খোলে আশে পাশের সন্তানদের পবিত্র কুরআন শিক্ষা দিতেন। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনো শুরু হয় তারাকান্দি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯১৯ সালে তারাকান্দি সিনিয়র মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। পরবর্তীতে ১৯২৭ সালে ঢাকার নয়াবাজারে অবস্থিত হাম্মাদিয়া মাদ্রাসায় (বর্তমান হাম্মাদিয়া গভর্নমেন্ট হাই স্কুল) ভর্তি হোন। সেখানের চূড়ান্ত পরীক্ষায় পাশ করে কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অধীনে টাইটেল পরিক্ষায় ৩য় স্থান অর্জন করেন। জ্ঞান অন্বেষণের অদম্য নেশা তাকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।তিনি ১৯৩০ সালে ভারতের দারুল দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হোন। ১৯৩১ সালে দাওয়ায়ে হাদীস ও তাফসীর পরিক্ষায় তিনি প্রথমস্থান অর্জন করেন। ১৯৩২/১৯৩৩ সালে লাহোর ওরিয়েন্টাল কলেজে শিক্ষালাভ করার পর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাযিল - ই- ইলম খেতাব পান। শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি ভারতের অন্যতম রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, লেখক ও ইসলামী পণ্ডিত, আমিরুল হিন্দ, শাইখুল ইসলাম আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ : এঁর সান্যিধ্য লাভ করতে পুনরায় তার কাছে বোখারী ও মুসলিম শরীফের দরসে অংশ নেন। মাদানীর সান্নিধ্যে এসে তিনি তাছাওফের শিক্ষালাভ করতে তাঁর হাতে বায়আত গ্রহন করেন। মাদানী রহ: এঁর সংশ্রবে থেকে উনার থেকে খেলাফতও লাভ করেন। প্রিয় শায়েখের পরামর্শক্রমে হুসাইনী রহ. বাংলাদেশে চলে এলেও নিয়মিত শাইখের সাথে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতেন। তার চিন্তা, কাজকর্ম, ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক পথচলা সবকিছই ছিল তার শাইখের আদর্শে অনুপ্রাণিত। মাদানী রহ. আ: হালিম হুসাইনীকে "বাহরুল উলুম " জ্ঞানের সাগর" ও" মাশআরুল উলুম" জ্ঞানের শিখা উপাধীতে ভূষিত করেছিলেন। মাদানী রহ: এঁর সান্নিধ্যে থাকাকালে নিজ গ্রাম তারাকান্দি মাদ্রাসায় শিক্ষকতার জন্য প্রস্তাব আসলে শায়েখের পরামর্শক্রমে কিছুদিন পর নিজ গ্রামের তারাকান্দি সিনিয়র মাদ্রাসায় ৩/৪ বৎসর শিক্ষকতা ও মাদ্রাসার সার্বিক মান উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন। কিছুদিন পর এ দ্বায়িত্ব ছেড়ে ময়মনসিংহের ইশ্বরগঞ্জ থানার ধনিয়াকান্দি হামিদিয়া মাদ্রাসায় ৪ বৎসর, কিশোরগঞ্জের আওলিয়া পাড়া মাদ্রাসায় ৬ বৎসর ও ময়মনসিংহ নান্দাইলের জাহাঙ্গীরপুর সিনিয়র মাদ্রাসায় ৪ বৎসর অধ্যাপনা করে ধীরে ধীরে অত্র অঞ্চলের সুপ্রসিদ্ধ আলেম হিসেবে সর্বমহলে প্রশংসিত ও পরিচিতি লাভ করতে থাকেন। 



কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, গাজিপুর, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওলামায়ে কেরাম দ্বীনী ইলমের পূর্ণতা আনার জন্য হুসাইনী (র:) এর বাড়িতে টাইটেল তথা দাওরায়ে হাদিসে ইলমের জন্য ছুটে আসতেন। হুসাইনী রহ. মানুষদের আকৃত্তিম ভালবাসা ও ছাত্রদের ইলম অন্বেষণের আগ্রহ দেখে নিজ বাড়িতেই টাইটেল ক্লাস করাতেন। পর্যায়ক্রমে বাড়িতেই দূর-দূরান্ত থেকে ইলম পিপাসু ছাত্রের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে লাগলো, তখন বাড়ির পাশেই একটি টিনের ঘর তৈরি করে সেখানেই ক্লাস শুরু করেন। ১৯৬২ সালে ইসলামী জ্ঞান - বিজ্ঞান প্রচার প্রসারের লক্ষ্যে এই প্রতিষ্ঠানকেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন " তারাকান্দি জামিয়া হুছাইনীয়া আছ'আদুল উলুম কওমী ইউনিভার্সিটি। যা বর্তমানে সে অঞ্চলে হুজুরের টাইটেল মাদ্রাসা নামে সুপরিচিত।


শুধু একজন আলেম নন, সমাজের সার্বিক উন্নতি ও সংস্কারে আ:হালিম হুসাইনীর ভূমিকা ছিল অতুলনীয়।ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলের মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল কলেজ রাস্তাঘাটসহ সমাজের নানাবিধ উন্নয়নমূলক কাজে তার সক্রিয় অংশগ্রহন ও অবদান ছিল নজীরবিহীন। চলার পথে কোথাও রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী দেখলে সাথে সাথেই রাস্তা মেরামতে নেমে পড়তেন। এ দৃশ্য দেখে হুজুরের সফরসঙ্গী এমনকি স্থানীয় জনতারাও এসব কাজে সানন্দে ঝাঁপিয়ে পড়তো। এ অঞ্চলের বেশ কিছু রাস্তা আছে তার উদ্যোগে তৈরী। এসব রাস্তা লোকমুখে এখনও তার স্মৃতিকে ধারণ করে আসছে।


রাজনীতিতেও হুছাইনী রহ. ভূমিকা ছিল অনন্য। ১৯৫৪ সালে তিনি ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হোন। জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি থেকে মনোনীত হয়ে নিজ এলাকা থেকে তিনি দুইবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে হুছাইনী রহ. নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলেও তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রয়োজনীয়তা। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে স্থানীয় মুক্তিফৌজেরা নিয়মিত হুজুরের কাছে দোআর জন্য আসতেন। পারিবারিক জীবনে ১৯৩৭ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হোন। তাঁর ঔরসে ৪ জন কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। ১৯৭৩ সালের ১৯ নভেম্বর সামাজিকভাবে মানুষের ঈমান আক্বীদা সংরক্ষণ করা ও সামাজিক সেচ্ছাসেবা করার লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তানজীমুল মুসলিমীন বা মুসলিম সংহতি সংস্থা নামে। তিনি  ১৯৭৬ সালে পবিত্র হজ্ব পালন করেন। 


আল্লামা আ: হালিম হুছাইনী রহ.১৯৮৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জুমাবার দিবাগত রাতে নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন।পরদিন শনিবার বিকাল ৩ টায়

পাকুন্দিয়া পাইলট স্কুল মাঠে তারা জানাজার সালাত অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার সালাতে ইমামতি করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলেম, আওলাদে রাসুল আল্লামা সাইয়্যাদ সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিন সাহেব। 

তৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থা বর্তমানের মত আধুনিক না হলেও তার জানাজায় অংশ নেন সারাদেশ থেকে লাখো মুসল্লী। পাকুন্দিয়া বাজারের চারপাশ এলাকায়, এমনকি কয়েক কিলোমিটার রাস্তা পর্যন্ত ছিল মানুষের কাঁতার। এ মহামনিষীর শেষ বিদায়ে সর্বসাধারণ মানুষের এমন উপস্থিতি প্রমান করে তাঁর প্রতি সাধারন মানুষের কত ভালবাসা ছিল। তিনি জয় করে নিয়েছিলেন মানুষের হৃদয়। জানাজা শেষে তাঁর হাতেগড়া প্রতিষ্ঠান তারাকান্দি জামিয়া হুছাইনিয়া আছ'আদুল উলুম কওমী ইউনিভার্সিটির ময়দানে তাকে দাফন করা হয়। এখানেই চির নিদ্রায় শায়িত যুগশ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক, শাইখুল হাদীস, আল্লামা আ:হালিম হুসাইন রহ.। এ বুযুর্গের বিদায়ে শোকের ছায়া বইতে থাকে অত্র অঞ্চলে। তার পরহেজগারীতা,তার সুন্দর জীবনের চিত্র বৃহত্তর ময়মননসিংহ অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে। জীবদ্দশায় তাঁর কাছ থেকে প্রকাশিত বেশ কিছু কারামত লোকমুখে প্রচলিত আছে। বর্তমানের জামিয়ার দ্বায়িত্বে আছেন হুছাইনী রহ. এঁর নাতি রশিদ আহম্মদ জাহাঙ্গীর হুছাইনী। জামিয়াতে হিফজ বিভাগ, ১ম জামাত থেকে দাওরায়ে হাদীস ও এতিমখানায় প্রায় হাজার ইলম পিপাসু ছাত্ররা নিয়মিত কুরআন হাদীসের সবক নিচ্ছেন। প্রতি বৎসর ফাল্গুন মাসের প্রথম রবি ও সোমাবার উক্ত জামিয়ার সুবিশাল ময়দানে "খতমে বুখারী ও বার্ষিক ইছলাহী তালীমী জলসা " অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেশ বরেণ্য বুজুর্গ ওলামায়ে কেরাম নসহীত ও খতমে বুখারী করে থাকেন। সারাদেশ থেকে অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসল্লী ও হুছাইনী হুজুরের ভক্তবৃন্দ অংশগ্রহন করে থাকেন।


তরুণ আলেম ও গণমাধ্যমকর্মী,কিশোরগঞ্জ।

No comments

Theme images by gmutlu. Powered by Blogger.